পিনাক-৬ ট্র্যাজেডি: ছয় বছরেও মেলেনি সেই ২১ লাশের পরিচয়

২০১৪ সালের ৪ আগস্ট মুন্সীগঞ্জের মাওয়ায় উত্তাল পদ্মার প্রবল ঢেউয়ে পিনাক-৬ লঞ্চটি ডুবে যায় - সংগৃহীত ছবি

মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার পৌর গোরস্থানে ২১ জনের সারি সারি কবর। কবরে চির নিদ্রায় থাকা এই মানুষগুলোর পরিচয় কি, কোথায় তাদের বাড়ি ছিল, তাদের পেশাই বা কি ছিল- গত ছয় বছরেও তা জানা গেল না।

২০১৪ সালের ৪ আগস্ট মুন্সীগঞ্জের মাওয়ায় উত্তাল পদ্মার প্রবল ঢেউয়ে পিনাক-৬ নামের যাত্রীবাহী একটি লঞ্চ ডুবে যায়। সরকারি হিসেবে এই দুর্ঘটনায় ৪৯ যাত্রীর প্রাণহানি ঘটে। নিখোঁজ হন ৬৪ যাত্রী। পরে ভাটি অঞ্চল থেকে নিখোঁজদের মধ্যে ৩৯ জনের গলিত মরদেহ উদ্ধার করে শিবচরের পাচ্চর স্কুল মাঠে রাখা হয়। স্বজনরা পোশাকসহ নানা চিহ্ন দেখে ১৮ জনের পরিচয় নিশ্চিত করে মরদেহ নিয়ে যান। তবে ২১ জনের কোনো স্বজন পাওয়া যায়নি। পরে সরকারের তরফে ওই ২১ জনের মরদেহ শিবচর পৌর কবরাস্থানে দাফন করা হয়। ‘১ থেকে ২১’ পর্যন্ত একেকটি লাশের পরিচয় নম্বর দিয়ে দাফন করা হলেও গেল ৬ বছরে সেই পরিচয় সংখ্যাও মুছে গেছে কবর থেকে। কিন্তু আসল পরিচয় শনাক্ত হয়নি তাদের।

কবরে থাকা এই ২১ জনের স্বজনরা কি তাদের সন্ধান করছেন? তা নিশ্চিত হতে না পারলেও দেখা গেছে, অনেকেই এখনও পদ্মার তীরে ছুটে যান নিখোঁজ স্বজনের খোঁজে, হতাশ হয়ে ফেরেন তারা। আবার ছুটে যান পৌর কবরে। নাম-পরিচয়হীন সারিবদ্ধ কবরে থাকা লাশ নিজের স্বজন ভেবে চোখের পানি মোছেন।

৪ আগস্ট সেই পিনাক-৬ লঞ্চে ছিলেন রাজধানীর শিকদার মেডিকেল কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী নুসরাত জাহান হিরা। তার ছোট বোন নূর মোহাম্মদ রাইফেলস কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্রী ফাতেমাতুজ জোহরা স্বর্ণা এবং চীনের একটি ইউনিভার্সিটির ছাত্রী খালাতো বোন জান্নাতুন নাঈম লাকি। লঞ্চটিতে ওঠার আগে তিন বোন মোবাইল ফোনের ক্যামেরায় ছবি তুলে তা ফেসবুকে দিয়ে লিখেছিলেন, অন দ্য ওয়ে…সিস্টার্স জার্নি’। লঞ্চটি ডুবে যাওয়ার পর লাকির মরদেহ উদ্ধার হলেও দুই বোন হিরা-লাকির মরদেহ মেলেনি গত ছয় বছরেও।

হিরা-লাকির একজন স্বজন সোমবার সমকালকে বলছিলেন, হিরা ও লাকির বাবা শিবচরের নূরুল হক মিয়াও লঞ্চে ছিলেন। ওই দুর্ঘটনায় তিনি প্রাণে বাঁচলেও চোখের সামনে দুই মেয়ের হারিয়ে যাওয়া তিনি এখনও মেনে নিতে পারছেন না। পাগলপ্রায় এই বাবা এখনও দুই কন্যার খোঁজ করেন। মেয়েদের ছবি নিয়ে কান্নাকাটি করেন মা মাকসুদা বেগমও।

ওই ট্র্যাজেডিতে শিবচরের মিজানুরসহ পরিবারের চারজনের কারোরই মরদেহ পাওয়া যায়নি। পরিবারটির কারো কোন ছবিও নেই, যা স্মৃতি হিসেবে ধরে রাখবেন। ছেলে মিজানুর, পুত্রবধূসহ পরিবারের চারজনকে হারিয়ে রিজিয়া বেগম এখনো চোখের পানি ফেলেন।

সোমবার দুপুরে শিবচর উপজেলা নির্বাহী অফিসার আসাদুজ্জামান সমকালকে বলছিলেন, তৎকালীন প্রশাসন পরিচয়হীন ২১ লাশের দেহ থেকে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে তা সংরক্ষণ করেন। ওই সময়ে নিখোঁজদের অনেক স্বজনের দেহ থেকে নমুনা নিয়ে তা পরীক্ষা করা হলেও মেলেনি। এতে অজ্ঞাতপরিচয়ে থেকে গেছে ২১ জনের মরদেহ।

তিনি বলেন, ঘটনাটি অনেক বছর আগের হলেও বিষয়টি সম্পর্কে বর্তমান প্রশাসনও অবগত। শুরুর দিকে অনেক স্বজন ডিএনএ নমুনা দিলেও এখন আর কেউ খোঁজও নেন না।

এদিকে ওই লঞ্চডুবির ঘটনায় দু’টি মামলা হলেও এখনও বিচার শেষ হয়নি। চার্জশিটভুক্ত একজন আসামিকে গ্রেপ্তারও করা যায়নি। পিনাক-৬ এর মালিক ও তার ছেলেসহ কয়েক আসামি গ্রেপ্তার হলেও তারা জামিনে রয়েছেন বলে জানা গেছে।