খাদ্যপণ্য রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা যে কারণে কাজে আসে না

ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলার পর দেশে দেশে দেখা দিয়েছে খাদ্য ঘাটতি। এতে চাপের মুখে পড়েছে বিভিন্ন দেশের সরকার। কারণ মূল্যস্ফীতির সঙ্গে লাফিয়ে বাড়ছে খাদ্যপণ্যের দাম। অভ্যন্তরীণ বাজারে দেখা দিয়েছে অস্থিরতা। তাই পরিস্থিতি সামাল দিতে কিছু খাদ্য রপ্তানিকারক দেশ দরজা বন্ধ করে দিয়েছে। ২৩ মে মালয়েশিয়া পোল্ট্রি রপ্তানি নিষিদ্ধ করে। চলতি মাসের শুরুতে ভারত অভ্যন্তরীণ বাজার নিয়ন্ত্রণে গম রপ্তানি বন্ধ করে।

আন্তর্জাতিক খাদ্য নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর অন্তত ২০টি দেশ খাদ্যপণ্য রপ্তানির ওপর কম-বেশি বিধিনিষেধ আরোপ করে, যার পরিমাণ বিশ্ব চাহিদার ১০ শতাংশ। এ অবস্থায় জাতিসংঘ দেশগুলোর প্রতি সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করার আহ্বান জানিয়েছে। কারণ খাদ্য সরবরাহের মাধ্যমে বিশ্ব খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়। অন্যদিকে প্রশ্ন উঠেছে রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে দেশগুলো কী লাভবান হচ্ছে বা এটি কী কোনো কাজে আসছে?

নিষেধাজ্ঞা দিয়ে মূলত রপ্তানির জন্য নির্ধারিত খাদ্য অভ্যন্তরীণ বাজারে ব্যবহার করা হয়। এর মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ বাজারে কমতে পারে মূল্য। ২০০৭-২০০৮ সালের অর্থনৈতিক মন্দায় যখন পণ্যের মূল্য বেড়ে যায় তখনও এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়। কিছু দেশ দ্রুত শস্য রপ্তানি বন্ধ করে দেয়। গবেষণায় দেখা যায়, এ পদক্ষেপের মাধ্যমে তখন অভ্যন্তরীণ বাজারে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।

তবুও অন্যান্য কারণ থেকে রপ্তানি নিষেধাজ্ঞার প্রভাবকে আলাদা করা কঠিন হতে পারে। অনেক সময় রপ্তানি নিষেধাজ্ঞার ফলে বিপরীত চিত্র দেখা যায়, আসে না কাঙ্ক্ষিত ফলাফল। প্রথমত কৃষকরা অনেক সময় খাদ্য মজুত করে রাখতে পারে, অপেক্ষা করতে পারে নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ার।

ভার্মন্টের মিডলবেরি কলেজের ওবি পোর্টিয়াস বলেন, ২০০০ সালে দক্ষিণ ও পূর্ব আফ্রিকার পাঁচটি দেশ পর্যায়ক্রমে ভুট্টা রপ্তানি নিষিদ্ধ করার সময় এমনটি ঘটে থাকতে পারে। এসময় খাদ্যপণ্যের মূল্যে অস্থিরতা দেখা যায়। অন্যদিকে যে পণ্য রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা নেই কৃষক সেই দিকে ঝুঁকতে পারে। এমন সিদ্ধান্তে কমতে পারে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন।

এমনকি রপ্তানি নিষেধাজ্ঞার ফলে কোনো দেশের ভেতরে দাম কমলেও সেটা ভালো কিছু বয়ে আনে না। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে প্রচুর সংখ্যক দরিদ্র মানুষ তাদের জীবিকার জন্য কৃষির ওপর নির্ভর করে। ২০১৩ সালের একটি গবেষণা দেখা যায়, তানজানিয়ায় ভুট্টা রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা দারিদ্র্যের হার বাড়ায়। কারণ এতে দরিদ্র শ্রেণির মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। খাদ্য রপ্তানি নিষিদ্ধে সব সময় বেশি সুবিধা পায় শহরের বাসিন্দারা, যাদের প্রভাব-প্রতিপত্তি বেশি।

সম্প্রতি ইন্দোনেশিয়ায় পাম তেল রপ্তানি বন্ধের প্রতিবাদে বিক্ষোভ শুরু করে দেশটির কৃষকরা। কারণ সরকারের ওই সিদ্ধান্তে পাম চাষিদের রোজগার অর্ধেকে নেমে যায়।

স্থানীয় বাজারে মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতে গত ২৮ এপ্রিল পাম তেল রপ্তানি নিষিদ্ধ করে বিশ্বের শীর্ষ পাম উৎপাদক ইন্দোনেশিয়া। এতে বিশ্ববাজারে ভোজ্যতেলের সরবরাহ কমে যাওয়ার পাশাপাশি দামও বেড়ে যায় ব্যাপকভাবে। তবে মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েন ইন্দোনেশিয়ার পাম চাষিরা। সেখানে পাম ফলের দাম নেমে যায় প্রায় অর্ধেকে। অবশ্য তোপের মুখে দেশটির সরকার এরই মধ্যে নিষেধাজ্ঞা উঠিয় নিয়েছে।

তাই খাদ্য রপ্তানি নিষিদ্ধ একটি দেশের জন্য মিশ্র ফলাফল বয়ে আনে। কিন্তু বিশ্বজুড়ে যে সমস্যাটা হয় সেটা অনেকটাই পরিষ্কার। ছোট রপ্তানিকারক দেশগুলো এ ক্ষেত্রে বিশ্ববাজারে প্রভাব ফেলতে না পারলেও বড় দেশগুলো পারে। ভারত গম রপ্তানি নিষিদ্ধের পরই বিশ্ববাজারে দাম বেড়ে যায় ছয় শতাংশ। একটি দেশের এ ধরনের পদক্ষেপ অন্যদের উৎসাহিত করে। ২০০৮ সালে ভিয়েতনাম চাল রপ্তানির নিষেধাজ্ঞা দেয়। এরপর ভারত, চীন ও কম্বোডিয়াও একই পদক্ষেপ নেয়। সে সময় আন্তর্জাতিক বাজারে চালের দাম ৫২ শতাংশ বেড়ে যায়। তাছাড়া দেশগুলো একে অপরের ওপর প্রতিশোধ নিতে বিভিন্ন পণ্যে বিধিনিষেধ আরোপ করে। ফলে দেখা যায়, উচ্চ মূল্যস্ফীতি।

অর্থনীতিবিদরা পরামর্শ দেন যে, রপ্তানি নিষেধাজ্ঞার চেয়ে একটি ভালো সমাধান হবে বাণিজ্য উন্মুক্ত রেখে সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা। আরও ভালো হবে ইউক্রেন যুদ্ধের সমাপ্তি টানা ও দেশটির শস্য অবাধে রপ্তানি করার সুযোগ করে দেওয়া। দুর্ভাগ্যবশত, অদূর ভবিষ্যতে এটি অসম্ভব বলে মনে হচ্ছে।

সূত্র: দ্য ইকোনমিস্ট