ফের যমুনা-ব্রহ্মপুত্রের পানি বাড়ায় আতঙ্ক

টানা বন্যায় ক্ষতবিক্ষত দেশের ৩৩টি জেলা। দেড় মাসেরও বেশি সময় পর অধিকাংশ নদ-নদীর পানি বিপৎসীমার নিচে নেমে এলেও ফের বাড়ছে যমুনা ও ব্রহ্মপুত্র নদ-নদীর পানি। এতে আতঙ্কিত হয়ে উঠেছে উত্তরাঞ্চলের বন্যাকবলিত জনপদের মানুষগুলো। আবারও বন্যার আশঙ্কায় অনেকেই ঘরবাড়ি মেরামত শুরু করছেন না। বাড়ি ফেরার প্রস্তুতি নিয়েও আর ফেরেননি। থেকে গেছেন আশ্রয়কেন্দ্র, উঁচু সড়ক ও বাঁধে তৈরি করা ঝুপড়ি ঘরে।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র গতকাল সকালে জানিয়েছে, বর্তমানে শুধু গুড় ও ধলেশ্বরী নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে ২৪ ঘণ্টায় ১০১টি পর্যবেক্ষণাধীন পানিসমতল স্টেশনের ৩৬টিতে পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। ব্রহ্মপুত্র ও যমুনার পানি অব্যাহত বৃদ্ধি পাচ্ছে। গঙ্গা-পদ্মার পানি স্থিতিশীল আছে। তবে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আপার মেঘনা অববাহিকার অধিকাংশ নদ-নদীর পানি সমতল হ্রাস পাচ্ছে। সংস্থাটির হিসাবে এ মুহূর্তে দেশের কোনো জেলা বন্যাকবলিত নেই। তবে বিভিন্ন নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় চলতি মাসের শেষে ফের বন্যার ধাক্কা আসতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলীরা।

যমুনার পানি ফের বৃদ্ধি পাওয়ায় সিরাজগঞ্জের নিম্নাঞ্চলে আবারও পানি বাড়তে শুরু করেছে। ইতিমধ্যে প্লাবিত হয়েছে অনেক এলাকা। সেই সঙ্গে ব্রহ্মপুত্রের পানি বাড়ায় আবারও বন্যার আশঙ্কায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে টানা বন্যায় দুই মাসেরও বেশি সময় পানিবন্দী থাকা বানভাসি। এ ছাড়া যেসব এলাকা থেকে বন্যার পানি নেমে গেছে সেখানেও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারেননি বন্যাদুর্গতরা। ঘরবাড়িতে কাঁদা, কারও ঘর পুরোপুরি ভেঙে গেছে, হাতে নেই বাড়িঘর মেরামতের টাকা, নেই খাবার। এতে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হলেও দুর্ভোগ কমেনি দুর্গত এলাকার মানুষগুলোর।

সিরাজগঞ্জের চর মিরপুর এলাকার মনিজা খাতুন ও আম্বিয়া খাতুন বলেন, ‘স্বামী নেই। করোনা আর বন্যার কারণে সন্তানদের কাজ নেই। দুই মাস পানিবন্দী থাকার পর বাড়ি ফিরে দেখি সবকিছু তছনছ হয়ে গেছে। ঘর ঠিক করার চেষ্টা করছিলাম। ফের পানি বাড়ায় ঘরে আর ফিরতে পারলাম না। ওয়াপদার ওপর ঝুপড়ি ঘরে ফিরে আসলাম। ঘরে খাবার নেই, পানি নেই। এত কষ্ট আর সহ্য হয় না।’ তারা জানালেন, বন্যার শুরুতে সরকারি ত্রাণ হিসেবে ১০ কেজির মতো চাল পেয়েছিলেন। তা এক মাস আগেই শেষ হয়ে গেছে। এখন অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটছে। নদীর পানি পান করছেন। ডায়রিয়া লেগেই আছে।

আমাদের সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, টানা দুই মাস বন্যার পর চতুর্থ দফা ফের পানি বাড়ায় দিশাহারা হয়ে পড়েছে বন্যাকবলিতরা। এমনিতেই টানা বন্যায় ঘরবাড়ি, আসবাবপত্র নষ্ট হয়ে চরম ক্ষতির শিকার হয়েছে। তার মধ্যে আবার যমুনার পানি বাড়িঘরে ঢুকতে শুরু করেছে। এতে ঘরবাড়ি ধসে পড়ার আশঙ্কা করছে বন্যাকবলিতরা। এ ছাড়া করোনা ও বন্যার কারণে কর্মহীন অনেক পরিবার অর্ধাহারে-অনাহারে দিনযাপন করছে। সরকারি সহায়তার ১০ কেজি চাল এক মাস আগেই শেষ হয়েছে। দুর্গত পরিবারগুলোয় চরম খাদ্য, ওষুধ ও শুকনো খাবারের সংকট দেখা দিয়েছে। দেখা দিয়েছে পানিবাহিত ডায়রিয়া ও হাত-পায়ে ঘাসহ নানা রোগ। অনেক বসতভিটার চারপাশে পানি থাকায় শিশু-বয়োবৃদ্ধদের নিয়ে বন্দী জীবনযাপন করছে মানুষ। এ বছর টানা দুই মাসের বন্যায় জেলায় কৃষি, পুকুরের মাছ, রাস্তাঘাটসহ ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ফসল হারিয়ে কৃষকরাও দিশাহারা হয়ে পড়েছে। সহস্রাধিক বসতবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ফসলি জমি বিলীন হয়ে গেছে। নিঃস্ব হয়ে পড়েছে যমুনা পাড়ের মানুষ।

এদিকে এবারের দীর্ঘমেয়াদি বন্যায় পানিতে ডুবেছে ঢাকা, গাজীপুর, টাঙ্গাইল, মানিকগঞ্জ, ফরিদপুর, মুন্সীগঞ্জ, রাজবাড়ী, মাদারীপুর, শরীয়তপুর, গোপালগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, জামালপুর, চাঁদপুর, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, রাজশাহী, নওগাঁ, নাটোর, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, পাবনা, রংপুর, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, গাইবান্ধা, লালমনিরহাট, সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ এবং সুনামগঞ্জ জেলা। আট লক্ষাধিক পরিবারের প্রায় ৫০ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বন্যায়। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রাস্তাঘাট, ব্রিজ-কালভার্ট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। নদীভাঙনে বিলীন হয়ে গেছে শত শত মানুষের ভিটামাটি। এক মাস আগেও আর্থিকভাবে সচ্ছল থাকা অনেক পরিবার নদীভাঙনে ঘরবাড়ি হারিয়ে সড়কে আশ্রয় নিয়েছে। বন্যায় ফসল নষ্ট হয়ে যাওয়ায় বিলাপ করছেন দিশাহারা কৃষক।