সুন্দরবনে শিশুকে চার দিন আটকে রেখে নির্যাতন

ভাইয়ের সঙ্গে সুন্দরবনে ট্রলার নিয়ে মাছ ধরতে গিয়েছিল বছর এগারোর শিশু মো. ইমাম হোসেন। হঠাৎ তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন বনরক্ষীরা। ধরে নিয়ে যাওয়া হয় শরণখোলা রেঞ্জ কার্যালয়ে। বড়দের আদালতে চালান করে দেওয়া হলেও আটকে রাখা হয় ছোট্ট ইমামকে। একটি ঘরে আটকে রেখে চলে অকথ্য নির্যাতন। পরে তাকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ভর্তি করান মা আমিরুননেছা।

সাংবাদিকদের ওই নারী বলেন, উপজেলার সুন্দরবন সংলগ্ন সাউথখালী ইউনিয়নের সোনাতলা গ্রামে আমাদের বাড়ি। গত ১০ আগস্ট ইমাম ও তার ভাই মিলন উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান মো. হাসানুজ্জামান পরভেজের মালিকানাধীন একটি ট্রলারে মাছ ধরতে সাগরে যায়। কিন্তু তার একদিন পরই শুনি, সুন্দরবনের কটকা অফিসের বনরক্ষীরা সবাইকে আটক করেছে। পরে মিলনসহ অন্যদের বাগেরহাট আদালতে চালান করে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ইমামকে ফেরত পেতে আমি কটকা অফিসের (ইনচার্জ) আবুল কালামের সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগ করি। এমনকি মোটরসাইকেল ভাড়া করে মেয়েজামাই রবিউলকে বাগেরহাট (ডিএফও) অফিসে পাঠাই। কিন্তু তার

কাছে আমার ছেলেটাকে ফেরত দেননি ফরেস্টাররা (বন কর্মকর্তা)। একপর্যায়ে নানা অনুনয়-বিনয় করলে চার দিন পর গত শুক্রবার রাত ৯টার দিকে ইমামকে অসুস্থ অবস্থায় আমার হাতে তুলে দেন শরণখোলা রেঞ্জ কর্মকর্তা (এসিএফ) মো. জয়নাল আবেদীন। ছেলেটা অসুস্থ কেন জানতে চাইলে তারা আমাকে উল্টো গালমন্দ করেন।

তার ওপর চলা নির্যাতরে বর্ণনা দিয়ে ইমাম বলে, নদীতে যাওয়ার পরের দিন ট্রলারের সবাইকে ধরে বাগেরহাট নিয়ে যান স্যাররা (বনরক্ষী)। সেখানে গেলে আমাকে একটি বিল্ডিংয়ের ভেতর আটকে তালা মেরে রাখে। পরে আবার সুন্দবনের কটকায় নিয়ে যায়। ধরা পড়ার পর চার দিন আমি ঠিকমতো খেতেও পারিনি। এ ছাড়া কটকা অফিসের বড় স্যার ও শরণখোলা রেঞ্জ কার্যালয়ের (এসিএফ) দালাল নামে খ্যাত সোনাতলার মো. আলম হাওলাদারসহ অনেকেই আমাকে মারধর করেন। মারতে মারতে তারা বলেন, ‘সুন্দরবনে আর আসবি? এখন যদি তোকে মেরে ফেলি?’ এমন অনেক ভয় দেখান।

ট্রলারের মালিক মো. হাসানুজ্জামান পারভেজ বলেন, কটকার (ওসি) আবুল কালামের অনৈতিক দাবি পূরণ না করায় তিনি ক্ষিপ্ত। তাই সাগরে ইলিশ আহরণের কাজে নিয়োজিত আমার অধীনস্থ জেলেদের পারমিট দেখার ভান করে কটকা অফিসে ডেকে নিয়ে একটি রুমে আটকে রাখেন। পরে সুন্দরবনের নিষিদ্ধ এলাকায় মাছ ধরার কাল্পনিক অভিযোগ সাজিয়ে ৯ জেলের সঙ্গে শিশু ইমামকে বাগেরহাটে চালান করে দেওয়া হয়। কিন্তু সোনাতলার বাসিন্দা মো. খলিল খানের ছেলে ইমাম প্রাপ্তবয়স্ক না হওয়ায় তাকে ওই মামলায় আসামি করা হয়নি। তাই ওকে আদালতে না তুলে অফিস (ডিএফও) এলাকার একটি বিল্ডিংয়ে আটক রাখেন বনরক্ষীরা। এমনকি তাকে পরিবারের কাছে হস্তান্তর না করে চার দিন ধরে গহিন সুন্দরবনে নিয়ে নির্যাতন করেছে। নানা তালবাহানা শেষে গত শুক্রবার রাতে অসুস্থ অবস্থায় ছেলেটিকে ফেরত দেওয়া হয়। এ ঘটনায় তিনি আইনি পদক্ষেপ নেবেন বলে জানান। তবে অভিযোগের বিষয়ে জানতে পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের আওতাধীন কটকা অভয়ারণ্য ওসি মো. আবুল কালামের মুঠোফোনে অনেকবার চেষ্টা করেও তা বন্ধ পাওয়া যায়।

শরণখোলা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক মো. জয়নাল আবেদীন অবশ্য বলেন, ওই শিশুর সঙ্গে কেউ কোনো খারাপ আচারণ করেছেন কিনা তা আমার জানা নেই। কটকা থেকে বনরক্ষীরা তাকে আমার কার্যালয়ে নিয়ে এলে (শুক্রবার) রাতেই তার মায়ের হাতে তুলে দেওয়া হয়। ওই সময় ছেলেটা সুস্থই ছিল।